কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডের পুনর্জন্ম হচ্ছে বাংলাদেশে
সি রা জু র র হ মা ন
এ রকম প্রবাদ প্রায় সব ভাষা এবং সব সংস্কৃতিতেই আছে। ইংরেজিতে ‘কোল
উইল টেক নো আদার হিউ’, বাংলায় ‘কয়লা ধুলেও ময়লা ছাড়ে না’, গ্রামগঞ্জ
বাংলাদেশে ‘জাত যায় না ধুলে, খাসলত্ যায় না ম’লে’। আরেকটা প্রবাদ হচ্ছে
কুকুরের লেজ সাত বছর চোঙায় ভরে রাখলেও সোজা হয় না। মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ
হয় এই সুপ্রাচীন প্রবাদগুলো তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী লীগের
কথা মনে করেই।
আওয়ামী লীগ দল আর তাদের নেত্রীর রাজনীতির পোস্টমর্টেম করলে যে ফলাফল বেরিয়ে আসবে সেটা রীতিমত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশটাকে তারা শেখ মুজিবের বাপের সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে হাসিনারও বংশানুক্রমিক জমিদারি মনে করে এবং সে জমিদারি তারা পরিচালনা করে মধ্যযুগীয় রীতিতে পাইক-পেয়াদার ডাণ্ডাবাজির জোরে। প্রজা চাহিদামত খাজনা দেবে না, পুকুরের বড় মাছটা, গোয়ালের গরুটা, এমনকি মাঝে মাঝে ঘরের সুন্দরী মেয়েটাকেও দেবে না জমিদারের ভোগের জেন্য—এটা কি করে হতে পারে?
যুগের পরিবর্তন হয়েছে, সুতরাং মুখে হলেও মাঝে মাঝে গণতন্ত্রের কথা বলতে হবে। অথচ গণতন্ত্রের ভাষা তারা জানে না। আসলে তাদের মুখে গণতন্ত্র আর হৃদয়ে বাকশাল। তাই তারা বিরোধী দলকে, বিশেষ করে বিএনপি এবং সে দলের নেত্রীকে অবিরাম গালাগাল করছে, কদর্য ভাষায় টিটকারি আর বিদ্রূপ করছে। এদের কথাবার্তা শুনে মনে হবে না যে কোনো ভদ্র পরিবারে এদের জন্ম হয়েছে এবং সেখানে ভদ্রতা ও শালীনতা তাদের শেখানো হয়েছে।
ওরা ৫ জানুয়ারি নাকি একটা নির্বাচন করেছে। সংসদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে পাঁচ জানুয়ারির দিন দশেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে গেছে, নির্বাচনের আগেই সংসদে আওয়ামী লীগ গরিষ্ঠতা পেয়ে গেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে যা ঘটেছে তা হচ্ছে এই যে এই কেন্দ্রগুলোর ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে তাদের গণতান্ত্রিক ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা হয়েছে অবশিষ্ট ১৪৭ আসনে। তিনজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে হুকুমের দাস নির্বাচন কমিশন তিন দিনের হিসাব-নিকাশ শেষে ঘোষণা দিয়েছে যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে এসব কেন্দ্রে। কিন্তু কমিশনের হিসাবকে দেশে-বিদেশে কেউ বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। যাদের কথা ও বিচার বুদ্ধিকে বিশ্বাস করা যায় তাদের সবাই বলছেন যে কোথাও পাঁচ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। বহু ভোটকেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি। অর্থাত্ বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে বড়জোর এক দুই কিংবা তিন লাখ মানুষ ভোট দিতে পেরেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আর কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা সবাই বলেছেন এ নির্বাচন ‘ঝুটা হায়’, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য কিংবা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শুধু দিল্লির ভাইসরয় পঙ্কজ শরন ছাড়া। পঙ্কজ জানেন যে কোনো মূল্যে শেখ হাসিনাকে গদিতে রাখতে হবে, নইলে বাংলাদেশের গলায় পা দিয়ে ভারত আরও যা যা নিয়ে নিতে চায় সেগুলো পাওয়া যাবে না। সত্যি বটে বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নদীপথ এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর বিনামূল্যে ব্যবহারের অধিকার ভারত এর আগেই আদায় করে নিয়েছে। শুনেছি বাংলাদেশের কিছু কিছু গ্যাসও গোপনে ত্রিপুরা রাজ্যে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে ভারতের খাঁকতি মেটেনি।
বাংলাদেশের কয়লা ব্যবহার করে এবং সুন্দরবনসহ আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করে ভারতের জন্য বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজটা এখনও সমাপ্ত হয়নি। অভিন্ন নদীগুলোর উজানে যে আরও বাঁধ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তার বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিবাদ হলে চলবে না। তাছাড়া প্রকাশ্যে বাংলাদেশের গ্যাস ভারতে নিয়ে যাওয়া, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রকাশ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে সৈন্য আনা-নেয়া করা, দক্ষিণ তালপট্টিসহ বাংলাদেশের কোন কোন অংশ এবং বঙ্গোপসাগরের কিছু তেলক্ষেত্র দখল করাও আছে ভারতের পরিকল্পনার মধ্যে। ঢাকার গদিতে হাসিনা আসীন না থাকলে ভারতের সেসব আশা পূরণ হবার নয়। সেজন্যই হাসিনাকে নির্বাচনে জয়ী দেখানোর আশায় দিল্লির সরকার এক হাজার কোটি রুপি খরচ করেছে, নির্বাচনোত্তর সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলন দলনের জন্য বাংলাদেশের ভেতরে সৈন্য পাঠাচ্ছে বলেও শোনা যায়।
বিদেশি কূটনীতিকরা একবাক্যে বলছেন এটা কোনো কাজের কথা নয়, শিগগিরই এমন একটা নির্বাচন করতে হবে দেশের মানুষ যেটা গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বসমাজ যেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করতে পারবে। হাসিনার সরকার (অবৈধ) যা বলছে বা করছে সেটা গণভবনে কিংবা সচিবালয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বুদ্ধিগুলো আসছে দিল্লি থেকে। কখনও সরাসরি, কখনও ভাইসরয় পঙ্কজ শরনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের খরচে শেখ হাসিনার এক ডজন অনারারি ডিগ্রি ক্রয় করা এবং নোবেল পুরস্কার ক্রয়ের ব্যর্থ চেষ্টার কথা সবাই জানেন। ঠিক একই উপায়ে বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অভিনন্দন ক্রয়ের অভিযানে সেগুন বাগানের পররাষ্ট্র দফতর ওভারটাইম কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা দিচ্ছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা।
বিশেষ কিছু তাত্পর্য
এর একটা বিশেষ তাত্পর্য আছে। ভারত বৃহত্ দেশ। ভেতরে ভেতরে দারিদ্র্য, অস্পৃশ্যতা এবং গ্যাংরেপ যতই তার রাষ্ট্র কাঠামোতে ঘুণ ধরাচ্ছে বাইরের ফুটানি দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। সে বছরে বহু বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র কিনছে রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অঢেল বিলাস সামগ্রী এখন আমদানি করছে ভারতীয় নতুন ধনীরা। ভারতের মধ্যবিত্তের অঢেল কালো সম্পদের কিছুটাও লুট করে নেয়া এখন বিদেশি ব্যবসায়ীদের বড় লক্ষ্য। রফতানিকারকরা তো বটেই, বিশ্ব ফোরামে ভারতের পণ্য এবং সমর্থন প্রায়ই চায় বিভিন্ন দেশ। ভারতীয় কূটনীতিকরা যখন সেসব দেশকে অনুরোধ করেন শেখ হাসিনাকে একটা লোক-দেখানো অভিনন্দন পাঠাতে তখন তারা সহজেই রাজি হয়ে যায়।
বিদেশিরা পরামর্শ দিচ্ছে অবিলম্বে একটা ভদ্রলোকের নির্বাচন করতে। ভদ্রলোক হতে গেলে ভদ্র ভাষায় কথা বলা শিখতে হয়। কূটনীতিকরা সেজন্য মুখোমুখি সংলাপের পরামর্শ দিচ্ছেন, দাবি জানাচ্ছেন। ৫ জানুয়ারির পরে পরে মনে হচ্ছিল যে বেকায়দায় পড়ে বুঝি গণভবনে সুবুদ্ধির জাগরণ ঘটছে। শেখ হাসিনা দাবি করলেন তার আগে খালেদা জিয়াকে তার আন্দোলন ও অবরোধ বন্ধ করতে হবে। অন্যেরা দাবি করলেন খালেদা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ না করলে সংলাপ হবে না। এসবকে সংলাপে সম্মতির লক্ষণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছিল। ভারত ছাড়া অন্য বিদেশিরা এখন আর জামায়াতকে সন্ত্রাসী দল বিবেচনা করে না। তবু রাষ্ট্রদূতরা একের পর এক গুলশানে গেলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করলেন, তাকে বোঝালেন যে ওই গোঁয়ার মেয়েটা যখন জেদ ধরেছে নতুন নির্বাচনের স্বার্থে তাঁর (খালেদার) উচিত জামায়াতকে দূরে রাখা।
খালেদা কিছুদিন ধরে সেটাই করে আসছেন। তিনি আন্দোলন হরতাল আর অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করার ডাক দিলেন। দেশের গ্রামে-গঞ্জে আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণতন্ত্রকামীরা প্রমাদ গুনছে। এখন তারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। এদিকে টাকা-দিয়ে-কেনা ডজন ডজন অভিনন্দন হাতে পেয়ে হাসিনা এখন উল্লাস করছেন, তিনি ভাবছেন তার সব ফাঁড়া কেটে গেছে। এখন তিনি নামে না হলেও কার্যত বাকশালী স্বৈরশাসক হয়ে গেছেন, এখন যা খুশি তাই করতে পারেন তিনি। হাসিনার এখন কৌশল হচ্ছে কিছু লোককে তোয়াজ করে, এখানে-সেখানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করা, যাতে পাকাপাকি একটা বাকশালী ‘সাদ্দাদের বেহেশত’ বানিয়ে ফেলার সুযোগ তিনি পান।
আবার খালেদা জিয়াকে অপমান করতে এবং টিটকারি করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। লক্ষণটা অবশ্যই এই যে এসবের পর হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে বসতে খালেদা জিয়ার গা ঘিন ঘিন করবে, তিনি আর সংলাপের কথা বলবেন না। জঙ্গলের শেয়ালগুলো একই সুরে হুক্কাহুয়া ডাকে। কিন্তু আওয়ামী শেয়ালদের একেকজনের একেক সুর। তাদের কেউ বলছেন সংলাপের আগে বর্তমান সরকারকে বৈধতা দিতে, স্বীকার করে নিতে হবে খালেদা জিয়াকে। কেউ বলছেন সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। একজন বলেছেন, খালেদাকে নিজের থুথু গিলে খেতে হবে, নাকে খত্ দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে যেতে হবে। সন্দেহ হতে পারে এই লোকটার বংশে কখনও কোনো সভ্য লোক ছিল না। হাছান মাহমুদ খালেদা জিয়ার জন্ম নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন জন্মসূত্রে খালেদা ভারতীয় আর চেতনায় পাকিস্তানি, তাই তাকে পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। কিন্তু জন্মের কথা বলতে গেলে অনেক কথা বেরিয়ে আসে। সিনিয়র উকিল, তার জুনিয়র আর মুহুরি নিয়ে অনেক কথা বাংলাদেশে অনেকেরই জানা আছে। আর শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে ছিলেন, এখন ঢাকায় আছেন দিল্লিরই মদতে। সুতরাং তার পক্ষেই দিল্লিতে চলে যাওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হবে।
মেয়েটাকে এখন ফিরিয়ে আনুন
অনেকেই আমাকে বলেছেন শেখ হাসিনা ভারতের প্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা নন। তাদের মতে সুযোগ পেলে দিল্লি আওয়ামী লীগের নেতা করবে তোফায়েল আহমেদকে। একাত্তর সালে ভারতীয় মিলিটারি একাডেমিতে পাঠানো তথাকথিত মুজিব বাহিনীর নেতা ছিলেন তোফায়েল। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করা হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে বর্ণচোরা সামরিক সরকারের সময়ে বাংলাদেশে এসে ভারতের তত্কালীন অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তোফায়েল, আমু ও সুরঞ্জিতকে নিয়ে গোপন বৈঠক করেছিলেন। শোনা গিয়েছিল যদি বর্ণচোরা সামরিক সরকার তাদের মাইনাস-টু ফর্মুলা চালু করে তাহলে ভারত তোফায়েল আহমেদকে আওয়ামী লীগের নেতা করবে।
শেখ হাসিনা সে গোপন বৈঠকের কথা শুনে ফেলেছিলেন। সে জন্যই ২০০৯ সালের সরকার থেকে তিনি তোফায়েলকে বাদ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি দিল্লিতে গিয়ে তোফায়েল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে অনেক গোপন পরামর্শ নিয়ে এসেছেন। দেশে ফিরে তোফায়েল যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বললেন, কিসের সংলাপ? কিসের নির্বাচন? আমরা তো সংলাপের কিংবা নির্বাচনের কথা বলিনি, বলেছে বিদেশিরা। অবশ্যই দিল্লি তাকে ছবক দিয়েছে, সংলাপ আর নতুন নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের কবর শান-বাঁধাই হয়ে যাবে।
এদিকে, বাংলাদেশ এখন সত্তরের দশকের কম্বোডিয়ার মতো একটা কিলিং ফিল্ডে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াত আর বিএনপির কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু নিজ দলের ভেতরের রাজাকার আর আল বদরদের কথা উঠলেই ক্ষেপে যান তিনি। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সুন্দর একটা কথা বলেছেন : রাজাকারের বাড়ি থেকে নিজের মেয়েটাকে নিয়ে আসুন। এসব ডামাডোলের আড়ালে ৫ জানুয়ারির পর থেকে প্রায় দিনই দু’চারটি গলাকাটা লাশ পাওয়া যাচ্ছে, বন্দুক-যুদ্ধের মিথ্যা অপবাদে বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। পুলিশ-র্যাব ধরে নিয়ে যাবার পর কর্মীদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে, আর পুলিশ বলছে ক্রস ফায়ার কিংবা বন্দুক-যুদ্ধে মারা যাচ্ছে তারা। প্রায়ই ভীতিকর পরিসংখ্যান ছাপা হচ্ছে পত্রিকায় : ২২ দিনে ৮৮ গলাকাটা লাশ, ৪৩ দিনে ৫৯ জামায়াত নেতাকর্মী নিহত, ২৪ ঘণ্টায় ১৮ খুন ইত্যাদি ইত্যাদি। কোনো কোনো পত্রিকার খবর অনুযায়ী গত বছর সরকারের দলীয়কৃত পুলিশ র্যাব আর সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে জামায়াতের ১৮৩ জন এবং শিবিরের ৭২ জন নেতাকর্মী খুন হয়েছিলেন। বিচ্ছিন্ন এবং টুকরো টুকরো খবরগুলো থেকে অবশ্যই মনে হবে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশার পর থেকে ১৯-২০ দিনে সেসব সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
এসব দৃষ্টে আওয়ামী লীগের মতিগতি এবং শেখ হাসিনার মতলবের কথা কী মনে হয় আপনাদের? একথা কি মনে হয় না যে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে কম্বোডিয়ার তিন কমিউনিস্ট নেতা পল পত্, লেং সারি আর সন নেসের নেতৃত্বে গোটা দেশটাকে স্ট্যালিনপন্থী কমিউনিস্ট রাস্ট্রে পরিণত করার জন্য যে রকম অমানুষিকভাবে এক মিলিয়নেরও (দশ লাখ) বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, ১৯৭২-৭৩ সালে শেখ মুজিব যেভাবে বিরোধী দলবিহীন শাসন চালানোর জন্য রক্ষীবাহিনীকে দিয়ে ৪০ হাজার মানুষ খুন করিয়েছিলেন, সেভাবে বিরোধী দলবিহীন ভারতের দাস একটি বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে এখন বাংলাদেশে? বেছে বেছে জামায়াত, শিবির আর বিএনপির কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে বেছে বেছে আকাশ থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা দ্রুততর করার জন্য ইসরাইল থেকে পাইলটবিহীন ড্রোন বিমান সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু করেছে সরকার—যে পন্থায় ইসরাইল গাজা আর পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা করেছে, আর যে পন্থায় মার্কিনিরা এখনও পাকিস্তানের আনাচ-কানাচ থেকে খুঁজে আল কায়দা, তালেবান আর জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতাদের হত্যা করছে।
বিশ্বের ইতিহাস যে শিক্ষা দেয়
আওয়ামী লীগ এবং তাদের ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকরা বিশ্বের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করছে। পাকিস্তানে মানুষকে গণতন্ত্র দিতে অস্বীকার করা হচ্ছিল। ফলে সে দেশের গণতন্ত্রের রাজনীতি দুর্বল হয়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। আমেরিকার ইন্ধনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জমিয়তকে ধ্বংসের অভিযান চালায়। সে দেশে গড়ে ওঠে জমিয়তের চাইতেও শতগুণ হিংস্র আল কায়দা আর তালেবানের প্রভাব। পাকিস্তানে আর আফগানিস্তানে তারা একাকার হয়ে আছে। বারো বছর যুদ্ধ করে মার্কিনিরা আর তাদের পশ্চিমি মিত্ররা তাদের পরাস্ত করতে পারেনি। ব্রিটিশরা এ বছরে সৈন্য সরিয়ে আনছে আফগানিস্তান থেকে, মার্কিনিরা সরিয়ে নেবে আগামী বছর। তালেবান আর আল কায়দারা এখন আমেরিকার সরে যাবার অপেক্ষা আছে।
মিসরে জনতা তিন বছর আগে বিপ্লব করে হোসনি মোবারকের তিন দশকের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। মিসরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তারা মোহাম্মদ মুরসিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। মুরসির সরকার গোড়া থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। আমেরিকার অর্থ সাহায্যপুষ্ট মিসরীয় সেনাবাহিনী মুরসিকে গদিচ্যুত করে তার ‘বিচার’ করছে। কিন্তু ওদিকে সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা আল কায়দা প্রভাবিত মিসরীয়রা এবং তাদের সহযোগী বিদেশিরা এখন মিসরে সন্ত্রাস শুরু করেছে। গত কয়দিনে তাদের বিস্ফোরিত বোমায় অর্ধ শতাধিক মানুষ মারা গেছে। মোবারকের গোয়েন্দাপ্রধান এবং বর্তমানে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি নিজেকে ফিল্ড মার্শাল করেছেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আয়োজন করেছেন। প্রায় সুনিশ্চিত বলা যায় মিসরের ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় হবে সহিংস প্রতিবাদ আর রক্তের অক্ষরে লেখা।
সিরিয়ার বংশানুক্রমিক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তিন বছর ধরে গণতন্ত্রের আন্দোলনকে পরাভূত করার লক্ষ্যে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশটা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিরোধের ছলে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র এবং আফ্রিকা-ইউরোপ থেকেও যেসব মোজাহিদ এসেছে সিরিয়ায় তারা উগ্র ইসলামপন্থী। প্রেসিডেন্ট আসাদ এখন ভীত, আতঙ্কিত। খুবই বিলম্বে তার সরকার এখন জেনেভায় গণতান্ত্রিক বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে।
ইউক্রেনের গরিষ্ঠ জনতা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আধিপত্যবাদী রাশিয়ার চাপে প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ বিপরীতমুখী চুক্তি করেছেন মস্কোর সঙ্গে। দু’মাস আগে রাজধানী কিয়েফের জনতা সেই যে লাগাতার প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেছে সে আন্দোলন এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে আরও বহু শহরে-নগরে। ইয়ানুকোভিচ প্রতিবাদ আন্দোলন নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবাদ তাতে বেড়েই গেছে। বাধ্য হয়ে সে আইন এখন তিনি বাতিল করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মাইকোলা আজারফ পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন প্রেসিডেন্টের কাছে। আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক কিছু তাকে ছাড় দিতে হবে।
খালেদা জিয়াকে এখন যা করতে হবে
ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে ভুল পক্ষকে সমর্থন দিয়ে আমেরিকা এখন খেসারত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও খেসারত তাকে দিতে হবে। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে ভারতের চাপে বর্ণচোরা সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে এবং ২০০৮ সালে একটা মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনে মদত দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছে আমেরিকা। এখন যদি আবারও ভারতের চাপে পড়ে ভোটারবিহীন তামাশার নির্বাচনের নামে শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয় তাহলে আরও মারাত্মক ভুল করবে আমেরিকা। সাংবিধানিক পন্থায় গণতন্ত্রের দাবির পথরোধ করা হলে বাংলাদেশ অতি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের পথে ধাবিত হবে। সে যুদ্ধ বিদেশে মিত্র খুঁজবে এবং উত্তরপূর্ব ভারতের সাতটি বিদ্রোহী রাজ্যের কাছ থেকে সমর্থনের প্রসারিত হাত প্রত্যাশা করবে।
কূটনৈতিক চাপে পড়ে খালেদা জিয়া কিছু ভুল করেছেন। সে ভুল তাকে এখন শোধরাতে হবে। জিরিয়ে জিরিয়ে এবং পথের ধারে বসে পান-তামাক খেয়ে আন্দোলনে যে কাজ হয় না ইউক্রেনের কাছ থেকেও সে শিক্ষা তিনি নিতে পারেন। আওয়ামী লীগ এবং তার ভারতীয় মুরব্বিরা অবশ্যই চাইবে শুধু ১৮ দলের জোটই নয়, বিএনপিও ভেঙে খান খান হয়ে যাক। শঠের কথায় পিছল পথে চলতে যাওয়া তার পক্ষে কিছুতেই উচিত হবে না। আশার কথা জামায়াতের বেলায় খুব বেশি বিলম্ব এখনও হয়নি। জোট ভাঙার চাইতে জোটকে শক্তিশালী করার দিকেই খালেদা জিয়াকে এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিদেশিরা যদি ২০০৭-’০৮ সালের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে তাকে নির্ভর করতে হবে নিজের দল ও জোটের এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনতার শক্তির ওপর।
খালেদা জিয়া দেশ সফরে বেরুচ্ছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। সে সফরে তাকে অবিরাম আন্দোলন, অসহযোগ, অবরোধ, হরতাল ইত্যাদি সব প্রকারের প্রতিরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে। দেশবাসী অবশ্যই আশা করবে আওয়ামী লীগের ছলাকলা তিনি এখন ভালোভাবেই বুঝে গেছেন। বিরোধী দলের শক্তিহানি করার কৌশল হিসেবে তারা সব সময়ই সময় চায়। সময় নিয়ে তারা নিজেদের দুর্গ শক্তিশালী করতে সব রকমের চেষ্টা করবে। তাদের সে সময় দেয়া কোনো বিচক্ষণ সেনানায়কের পক্ষে মারাত্মক হবে।
serajurrahman34@mail.com
আওয়ামী লীগ দল আর তাদের নেত্রীর রাজনীতির পোস্টমর্টেম করলে যে ফলাফল বেরিয়ে আসবে সেটা রীতিমত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশটাকে তারা শেখ মুজিবের বাপের সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে হাসিনারও বংশানুক্রমিক জমিদারি মনে করে এবং সে জমিদারি তারা পরিচালনা করে মধ্যযুগীয় রীতিতে পাইক-পেয়াদার ডাণ্ডাবাজির জোরে। প্রজা চাহিদামত খাজনা দেবে না, পুকুরের বড় মাছটা, গোয়ালের গরুটা, এমনকি মাঝে মাঝে ঘরের সুন্দরী মেয়েটাকেও দেবে না জমিদারের ভোগের জেন্য—এটা কি করে হতে পারে?
যুগের পরিবর্তন হয়েছে, সুতরাং মুখে হলেও মাঝে মাঝে গণতন্ত্রের কথা বলতে হবে। অথচ গণতন্ত্রের ভাষা তারা জানে না। আসলে তাদের মুখে গণতন্ত্র আর হৃদয়ে বাকশাল। তাই তারা বিরোধী দলকে, বিশেষ করে বিএনপি এবং সে দলের নেত্রীকে অবিরাম গালাগাল করছে, কদর্য ভাষায় টিটকারি আর বিদ্রূপ করছে। এদের কথাবার্তা শুনে মনে হবে না যে কোনো ভদ্র পরিবারে এদের জন্ম হয়েছে এবং সেখানে ভদ্রতা ও শালীনতা তাদের শেখানো হয়েছে।
ওরা ৫ জানুয়ারি নাকি একটা নির্বাচন করেছে। সংসদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে পাঁচ জানুয়ারির দিন দশেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে গেছে, নির্বাচনের আগেই সংসদে আওয়ামী লীগ গরিষ্ঠতা পেয়ে গেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে যা ঘটেছে তা হচ্ছে এই যে এই কেন্দ্রগুলোর ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে তাদের গণতান্ত্রিক ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা হয়েছে অবশিষ্ট ১৪৭ আসনে। তিনজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে হুকুমের দাস নির্বাচন কমিশন তিন দিনের হিসাব-নিকাশ শেষে ঘোষণা দিয়েছে যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে এসব কেন্দ্রে। কিন্তু কমিশনের হিসাবকে দেশে-বিদেশে কেউ বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। যাদের কথা ও বিচার বুদ্ধিকে বিশ্বাস করা যায় তাদের সবাই বলছেন যে কোথাও পাঁচ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। বহু ভোটকেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি। অর্থাত্ বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে বড়জোর এক দুই কিংবা তিন লাখ মানুষ ভোট দিতে পেরেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আর কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা সবাই বলেছেন এ নির্বাচন ‘ঝুটা হায়’, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য কিংবা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শুধু দিল্লির ভাইসরয় পঙ্কজ শরন ছাড়া। পঙ্কজ জানেন যে কোনো মূল্যে শেখ হাসিনাকে গদিতে রাখতে হবে, নইলে বাংলাদেশের গলায় পা দিয়ে ভারত আরও যা যা নিয়ে নিতে চায় সেগুলো পাওয়া যাবে না। সত্যি বটে বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নদীপথ এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর বিনামূল্যে ব্যবহারের অধিকার ভারত এর আগেই আদায় করে নিয়েছে। শুনেছি বাংলাদেশের কিছু কিছু গ্যাসও গোপনে ত্রিপুরা রাজ্যে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে ভারতের খাঁকতি মেটেনি।
বাংলাদেশের কয়লা ব্যবহার করে এবং সুন্দরবনসহ আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করে ভারতের জন্য বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজটা এখনও সমাপ্ত হয়নি। অভিন্ন নদীগুলোর উজানে যে আরও বাঁধ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তার বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিবাদ হলে চলবে না। তাছাড়া প্রকাশ্যে বাংলাদেশের গ্যাস ভারতে নিয়ে যাওয়া, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রকাশ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে সৈন্য আনা-নেয়া করা, দক্ষিণ তালপট্টিসহ বাংলাদেশের কোন কোন অংশ এবং বঙ্গোপসাগরের কিছু তেলক্ষেত্র দখল করাও আছে ভারতের পরিকল্পনার মধ্যে। ঢাকার গদিতে হাসিনা আসীন না থাকলে ভারতের সেসব আশা পূরণ হবার নয়। সেজন্যই হাসিনাকে নির্বাচনে জয়ী দেখানোর আশায় দিল্লির সরকার এক হাজার কোটি রুপি খরচ করেছে, নির্বাচনোত্তর সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলন দলনের জন্য বাংলাদেশের ভেতরে সৈন্য পাঠাচ্ছে বলেও শোনা যায়।
বিদেশি কূটনীতিকরা একবাক্যে বলছেন এটা কোনো কাজের কথা নয়, শিগগিরই এমন একটা নির্বাচন করতে হবে দেশের মানুষ যেটা গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বসমাজ যেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করতে পারবে। হাসিনার সরকার (অবৈধ) যা বলছে বা করছে সেটা গণভবনে কিংবা সচিবালয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বুদ্ধিগুলো আসছে দিল্লি থেকে। কখনও সরাসরি, কখনও ভাইসরয় পঙ্কজ শরনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের খরচে শেখ হাসিনার এক ডজন অনারারি ডিগ্রি ক্রয় করা এবং নোবেল পুরস্কার ক্রয়ের ব্যর্থ চেষ্টার কথা সবাই জানেন। ঠিক একই উপায়ে বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অভিনন্দন ক্রয়ের অভিযানে সেগুন বাগানের পররাষ্ট্র দফতর ওভারটাইম কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা দিচ্ছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা।
বিশেষ কিছু তাত্পর্য
এর একটা বিশেষ তাত্পর্য আছে। ভারত বৃহত্ দেশ। ভেতরে ভেতরে দারিদ্র্য, অস্পৃশ্যতা এবং গ্যাংরেপ যতই তার রাষ্ট্র কাঠামোতে ঘুণ ধরাচ্ছে বাইরের ফুটানি দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। সে বছরে বহু বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র কিনছে রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অঢেল বিলাস সামগ্রী এখন আমদানি করছে ভারতীয় নতুন ধনীরা। ভারতের মধ্যবিত্তের অঢেল কালো সম্পদের কিছুটাও লুট করে নেয়া এখন বিদেশি ব্যবসায়ীদের বড় লক্ষ্য। রফতানিকারকরা তো বটেই, বিশ্ব ফোরামে ভারতের পণ্য এবং সমর্থন প্রায়ই চায় বিভিন্ন দেশ। ভারতীয় কূটনীতিকরা যখন সেসব দেশকে অনুরোধ করেন শেখ হাসিনাকে একটা লোক-দেখানো অভিনন্দন পাঠাতে তখন তারা সহজেই রাজি হয়ে যায়।
বিদেশিরা পরামর্শ দিচ্ছে অবিলম্বে একটা ভদ্রলোকের নির্বাচন করতে। ভদ্রলোক হতে গেলে ভদ্র ভাষায় কথা বলা শিখতে হয়। কূটনীতিকরা সেজন্য মুখোমুখি সংলাপের পরামর্শ দিচ্ছেন, দাবি জানাচ্ছেন। ৫ জানুয়ারির পরে পরে মনে হচ্ছিল যে বেকায়দায় পড়ে বুঝি গণভবনে সুবুদ্ধির জাগরণ ঘটছে। শেখ হাসিনা দাবি করলেন তার আগে খালেদা জিয়াকে তার আন্দোলন ও অবরোধ বন্ধ করতে হবে। অন্যেরা দাবি করলেন খালেদা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ না করলে সংলাপ হবে না। এসবকে সংলাপে সম্মতির লক্ষণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছিল। ভারত ছাড়া অন্য বিদেশিরা এখন আর জামায়াতকে সন্ত্রাসী দল বিবেচনা করে না। তবু রাষ্ট্রদূতরা একের পর এক গুলশানে গেলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করলেন, তাকে বোঝালেন যে ওই গোঁয়ার মেয়েটা যখন জেদ ধরেছে নতুন নির্বাচনের স্বার্থে তাঁর (খালেদার) উচিত জামায়াতকে দূরে রাখা।
খালেদা কিছুদিন ধরে সেটাই করে আসছেন। তিনি আন্দোলন হরতাল আর অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করার ডাক দিলেন। দেশের গ্রামে-গঞ্জে আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণতন্ত্রকামীরা প্রমাদ গুনছে। এখন তারা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। এদিকে টাকা-দিয়ে-কেনা ডজন ডজন অভিনন্দন হাতে পেয়ে হাসিনা এখন উল্লাস করছেন, তিনি ভাবছেন তার সব ফাঁড়া কেটে গেছে। এখন তিনি নামে না হলেও কার্যত বাকশালী স্বৈরশাসক হয়ে গেছেন, এখন যা খুশি তাই করতে পারেন তিনি। হাসিনার এখন কৌশল হচ্ছে কিছু লোককে তোয়াজ করে, এখানে-সেখানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করা, যাতে পাকাপাকি একটা বাকশালী ‘সাদ্দাদের বেহেশত’ বানিয়ে ফেলার সুযোগ তিনি পান।
আবার খালেদা জিয়াকে অপমান করতে এবং টিটকারি করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। লক্ষণটা অবশ্যই এই যে এসবের পর হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে বসতে খালেদা জিয়ার গা ঘিন ঘিন করবে, তিনি আর সংলাপের কথা বলবেন না। জঙ্গলের শেয়ালগুলো একই সুরে হুক্কাহুয়া ডাকে। কিন্তু আওয়ামী শেয়ালদের একেকজনের একেক সুর। তাদের কেউ বলছেন সংলাপের আগে বর্তমান সরকারকে বৈধতা দিতে, স্বীকার করে নিতে হবে খালেদা জিয়াকে। কেউ বলছেন সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। একজন বলেছেন, খালেদাকে নিজের থুথু গিলে খেতে হবে, নাকে খত্ দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে যেতে হবে। সন্দেহ হতে পারে এই লোকটার বংশে কখনও কোনো সভ্য লোক ছিল না। হাছান মাহমুদ খালেদা জিয়ার জন্ম নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন জন্মসূত্রে খালেদা ভারতীয় আর চেতনায় পাকিস্তানি, তাই তাকে পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। কিন্তু জন্মের কথা বলতে গেলে অনেক কথা বেরিয়ে আসে। সিনিয়র উকিল, তার জুনিয়র আর মুহুরি নিয়ে অনেক কথা বাংলাদেশে অনেকেরই জানা আছে। আর শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে ছিলেন, এখন ঢাকায় আছেন দিল্লিরই মদতে। সুতরাং তার পক্ষেই দিল্লিতে চলে যাওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হবে।
মেয়েটাকে এখন ফিরিয়ে আনুন
অনেকেই আমাকে বলেছেন শেখ হাসিনা ভারতের প্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা নন। তাদের মতে সুযোগ পেলে দিল্লি আওয়ামী লীগের নেতা করবে তোফায়েল আহমেদকে। একাত্তর সালে ভারতীয় মিলিটারি একাডেমিতে পাঠানো তথাকথিত মুজিব বাহিনীর নেতা ছিলেন তোফায়েল। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করা হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে বর্ণচোরা সামরিক সরকারের সময়ে বাংলাদেশে এসে ভারতের তত্কালীন অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তোফায়েল, আমু ও সুরঞ্জিতকে নিয়ে গোপন বৈঠক করেছিলেন। শোনা গিয়েছিল যদি বর্ণচোরা সামরিক সরকার তাদের মাইনাস-টু ফর্মুলা চালু করে তাহলে ভারত তোফায়েল আহমেদকে আওয়ামী লীগের নেতা করবে।
শেখ হাসিনা সে গোপন বৈঠকের কথা শুনে ফেলেছিলেন। সে জন্যই ২০০৯ সালের সরকার থেকে তিনি তোফায়েলকে বাদ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি দিল্লিতে গিয়ে তোফায়েল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে অনেক গোপন পরামর্শ নিয়ে এসেছেন। দেশে ফিরে তোফায়েল যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বললেন, কিসের সংলাপ? কিসের নির্বাচন? আমরা তো সংলাপের কিংবা নির্বাচনের কথা বলিনি, বলেছে বিদেশিরা। অবশ্যই দিল্লি তাকে ছবক দিয়েছে, সংলাপ আর নতুন নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের কবর শান-বাঁধাই হয়ে যাবে।
এদিকে, বাংলাদেশ এখন সত্তরের দশকের কম্বোডিয়ার মতো একটা কিলিং ফিল্ডে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াত আর বিএনপির কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু নিজ দলের ভেতরের রাজাকার আর আল বদরদের কথা উঠলেই ক্ষেপে যান তিনি। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সুন্দর একটা কথা বলেছেন : রাজাকারের বাড়ি থেকে নিজের মেয়েটাকে নিয়ে আসুন। এসব ডামাডোলের আড়ালে ৫ জানুয়ারির পর থেকে প্রায় দিনই দু’চারটি গলাকাটা লাশ পাওয়া যাচ্ছে, বন্দুক-যুদ্ধের মিথ্যা অপবাদে বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। পুলিশ-র্যাব ধরে নিয়ে যাবার পর কর্মীদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে, আর পুলিশ বলছে ক্রস ফায়ার কিংবা বন্দুক-যুদ্ধে মারা যাচ্ছে তারা। প্রায়ই ভীতিকর পরিসংখ্যান ছাপা হচ্ছে পত্রিকায় : ২২ দিনে ৮৮ গলাকাটা লাশ, ৪৩ দিনে ৫৯ জামায়াত নেতাকর্মী নিহত, ২৪ ঘণ্টায় ১৮ খুন ইত্যাদি ইত্যাদি। কোনো কোনো পত্রিকার খবর অনুযায়ী গত বছর সরকারের দলীয়কৃত পুলিশ র্যাব আর সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে জামায়াতের ১৮৩ জন এবং শিবিরের ৭২ জন নেতাকর্মী খুন হয়েছিলেন। বিচ্ছিন্ন এবং টুকরো টুকরো খবরগুলো থেকে অবশ্যই মনে হবে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশার পর থেকে ১৯-২০ দিনে সেসব সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
এসব দৃষ্টে আওয়ামী লীগের মতিগতি এবং শেখ হাসিনার মতলবের কথা কী মনে হয় আপনাদের? একথা কি মনে হয় না যে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে কম্বোডিয়ার তিন কমিউনিস্ট নেতা পল পত্, লেং সারি আর সন নেসের নেতৃত্বে গোটা দেশটাকে স্ট্যালিনপন্থী কমিউনিস্ট রাস্ট্রে পরিণত করার জন্য যে রকম অমানুষিকভাবে এক মিলিয়নেরও (দশ লাখ) বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, ১৯৭২-৭৩ সালে শেখ মুজিব যেভাবে বিরোধী দলবিহীন শাসন চালানোর জন্য রক্ষীবাহিনীকে দিয়ে ৪০ হাজার মানুষ খুন করিয়েছিলেন, সেভাবে বিরোধী দলবিহীন ভারতের দাস একটি বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে এখন বাংলাদেশে? বেছে বেছে জামায়াত, শিবির আর বিএনপির কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে বেছে বেছে আকাশ থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা দ্রুততর করার জন্য ইসরাইল থেকে পাইলটবিহীন ড্রোন বিমান সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু করেছে সরকার—যে পন্থায় ইসরাইল গাজা আর পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা করেছে, আর যে পন্থায় মার্কিনিরা এখনও পাকিস্তানের আনাচ-কানাচ থেকে খুঁজে আল কায়দা, তালেবান আর জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতাদের হত্যা করছে।
বিশ্বের ইতিহাস যে শিক্ষা দেয়
আওয়ামী লীগ এবং তাদের ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকরা বিশ্বের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করছে। পাকিস্তানে মানুষকে গণতন্ত্র দিতে অস্বীকার করা হচ্ছিল। ফলে সে দেশের গণতন্ত্রের রাজনীতি দুর্বল হয়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। আমেরিকার ইন্ধনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জমিয়তকে ধ্বংসের অভিযান চালায়। সে দেশে গড়ে ওঠে জমিয়তের চাইতেও শতগুণ হিংস্র আল কায়দা আর তালেবানের প্রভাব। পাকিস্তানে আর আফগানিস্তানে তারা একাকার হয়ে আছে। বারো বছর যুদ্ধ করে মার্কিনিরা আর তাদের পশ্চিমি মিত্ররা তাদের পরাস্ত করতে পারেনি। ব্রিটিশরা এ বছরে সৈন্য সরিয়ে আনছে আফগানিস্তান থেকে, মার্কিনিরা সরিয়ে নেবে আগামী বছর। তালেবান আর আল কায়দারা এখন আমেরিকার সরে যাবার অপেক্ষা আছে।
মিসরে জনতা তিন বছর আগে বিপ্লব করে হোসনি মোবারকের তিন দশকের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। মিসরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তারা মোহাম্মদ মুরসিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। মুরসির সরকার গোড়া থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। আমেরিকার অর্থ সাহায্যপুষ্ট মিসরীয় সেনাবাহিনী মুরসিকে গদিচ্যুত করে তার ‘বিচার’ করছে। কিন্তু ওদিকে সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা আল কায়দা প্রভাবিত মিসরীয়রা এবং তাদের সহযোগী বিদেশিরা এখন মিসরে সন্ত্রাস শুরু করেছে। গত কয়দিনে তাদের বিস্ফোরিত বোমায় অর্ধ শতাধিক মানুষ মারা গেছে। মোবারকের গোয়েন্দাপ্রধান এবং বর্তমানে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি নিজেকে ফিল্ড মার্শাল করেছেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আয়োজন করেছেন। প্রায় সুনিশ্চিত বলা যায় মিসরের ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় হবে সহিংস প্রতিবাদ আর রক্তের অক্ষরে লেখা।
সিরিয়ার বংশানুক্রমিক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তিন বছর ধরে গণতন্ত্রের আন্দোলনকে পরাভূত করার লক্ষ্যে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশটা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিরোধের ছলে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র এবং আফ্রিকা-ইউরোপ থেকেও যেসব মোজাহিদ এসেছে সিরিয়ায় তারা উগ্র ইসলামপন্থী। প্রেসিডেন্ট আসাদ এখন ভীত, আতঙ্কিত। খুবই বিলম্বে তার সরকার এখন জেনেভায় গণতান্ত্রিক বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে।
ইউক্রেনের গরিষ্ঠ জনতা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আধিপত্যবাদী রাশিয়ার চাপে প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ বিপরীতমুখী চুক্তি করেছেন মস্কোর সঙ্গে। দু’মাস আগে রাজধানী কিয়েফের জনতা সেই যে লাগাতার প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেছে সে আন্দোলন এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে আরও বহু শহরে-নগরে। ইয়ানুকোভিচ প্রতিবাদ আন্দোলন নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবাদ তাতে বেড়েই গেছে। বাধ্য হয়ে সে আইন এখন তিনি বাতিল করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মাইকোলা আজারফ পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন প্রেসিডেন্টের কাছে। আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক কিছু তাকে ছাড় দিতে হবে।
খালেদা জিয়াকে এখন যা করতে হবে
ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে ভুল পক্ষকে সমর্থন দিয়ে আমেরিকা এখন খেসারত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও খেসারত তাকে দিতে হবে। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে ভারতের চাপে বর্ণচোরা সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে এবং ২০০৮ সালে একটা মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনে মদত দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছে আমেরিকা। এখন যদি আবারও ভারতের চাপে পড়ে ভোটারবিহীন তামাশার নির্বাচনের নামে শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয় তাহলে আরও মারাত্মক ভুল করবে আমেরিকা। সাংবিধানিক পন্থায় গণতন্ত্রের দাবির পথরোধ করা হলে বাংলাদেশ অতি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের পথে ধাবিত হবে। সে যুদ্ধ বিদেশে মিত্র খুঁজবে এবং উত্তরপূর্ব ভারতের সাতটি বিদ্রোহী রাজ্যের কাছ থেকে সমর্থনের প্রসারিত হাত প্রত্যাশা করবে।
কূটনৈতিক চাপে পড়ে খালেদা জিয়া কিছু ভুল করেছেন। সে ভুল তাকে এখন শোধরাতে হবে। জিরিয়ে জিরিয়ে এবং পথের ধারে বসে পান-তামাক খেয়ে আন্দোলনে যে কাজ হয় না ইউক্রেনের কাছ থেকেও সে শিক্ষা তিনি নিতে পারেন। আওয়ামী লীগ এবং তার ভারতীয় মুরব্বিরা অবশ্যই চাইবে শুধু ১৮ দলের জোটই নয়, বিএনপিও ভেঙে খান খান হয়ে যাক। শঠের কথায় পিছল পথে চলতে যাওয়া তার পক্ষে কিছুতেই উচিত হবে না। আশার কথা জামায়াতের বেলায় খুব বেশি বিলম্ব এখনও হয়নি। জোট ভাঙার চাইতে জোটকে শক্তিশালী করার দিকেই খালেদা জিয়াকে এখন বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিদেশিরা যদি ২০০৭-’০৮ সালের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে তাকে নির্ভর করতে হবে নিজের দল ও জোটের এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনতার শক্তির ওপর।
খালেদা জিয়া দেশ সফরে বেরুচ্ছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। সে সফরে তাকে অবিরাম আন্দোলন, অসহযোগ, অবরোধ, হরতাল ইত্যাদি সব প্রকারের প্রতিরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে। দেশবাসী অবশ্যই আশা করবে আওয়ামী লীগের ছলাকলা তিনি এখন ভালোভাবেই বুঝে গেছেন। বিরোধী দলের শক্তিহানি করার কৌশল হিসেবে তারা সব সময়ই সময় চায়। সময় নিয়ে তারা নিজেদের দুর্গ শক্তিশালী করতে সব রকমের চেষ্টা করবে। তাদের সে সময় দেয়া কোনো বিচক্ষণ সেনানায়কের পক্ষে মারাত্মক হবে।
serajurrahman34@mail.com

Comments
Post a Comment