আজকের ক্রসফায়ার : ৩১ জানুয়ারি

র‌্যাব-পুলিশের গুলিতে নিহত ৩

বাংলারজমিন ডেস্ক | ৩১ জানুয়ারি ২০১৪, শুক্রবার, 

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী, ফেনী ও সিরাজগঞ্জে র‌্যাব-পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছেন। এরা হলেন- সোনাইমুড়ী উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ, ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সরওয়ার এবং সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামী বাবলু মোল্লা। তবে পুলিশের দাবি তারা ক্রস ফায়ারে নিহত হয়েছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী ও সোনাইমুড়ী প্রতিনিধি জানান, পুলিশের গুলিতে সোনাইমুড়ী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তোহিদুল ইসলাম তৌহিদ (৩৫) নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতে জেলার সোনাইমুড়ীর আমিশাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। মামলায় আগাম জামিন নিতে তৌহিদুল ইসলাম ৪-৫ দিন আগে ঢাকায় গেলে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে পল্টন থানায় হস্তান্তর করে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ তৌহিদকে ঢাকা থেকে নোয়াখালীতে নিয়ে আসে। তৌহিদকে ঢাকা থেকে আনার সংবাদ জানার পর তার পরিবারের লোকজন সোনাইমুড়ী থানা, সুধারাম থানা ও ডিবি অফিসে সংবাদ জানার জন্য চেষ্টা করেও তৌহিদের হদিস পায়নি। থানায় কর্তব্যরত কেউই তৌহিদ থানা হেফাজতে বা পুলিশের হেফাজতে আছে বলে নিশ্চিত করেনি। স্থানীয় ১০নং আমিশাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল খায়ের ও তৌহিদের ভাই কামাল জানায়, রাত অনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সোনাইমুড়ী থানার এসআই মফিজের নেতৃত্বে পুলিশ তোহিদের বাড়ীতে গিয়ে ঘরের দরজা নক করে ঘরে থাকা পরিবারের অন্যদের ঘুম থেকে ডেকে তোলে। কামাল পুলিশের পরিচয় পেয়ে ঘরের দরজা খুলে তাদের সঙ্গে কথা বলে। পুলিশ কলাপসিবল গেট খুলতে বললে কামাল কলাপসিবল গেট না খুলে ঘরে থাকা অপর দু’ভাই নজরুল ও নাজিমকে ডেকে তোলে। নজরুল ও নাজিম ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পুলিশকে দেখলেও গেট না খোলায় কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ তৌহিদের বাড়ি ত্যাগ করে। এর ১০-১৫ মিনিট পর আমিশাপাড়া মেড়িপাড়া সীমানায় ২-৩টি গুলির শব্দ শোনে। পুলিশ ভোর রাতেই তৌহিদের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে বাড়ির কাচারিতে থাকা কাজের লোককে ডেকে তোলে ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদসহ সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাড়িয়ে দেয়। সকাল বেলায় টিভির স্ক্রলিংয়ে বিএনপি নেতা তৌহিদের লাশ উদ্ধার মর্মে সংবাদ দেখে তৌহিদের পরিবারের লোকজন নিশ্চিত হয় পুলিশ ভোর রাতেই লোকচক্ষুর আড়ালে তাকে গুলি করে হত্যা করে ভ্যান গাড়িতে করে নোয়াখালী সদর হাসপাতালের সামনে লাশ রেখে যায়। এদিকে তৌহিদ নিহত হওয়ার বিষয়ে থানা পুলিশের কোন বক্তব্য না পাওয়া গেলেও পুলিশ সুপার জানান, তৌহিদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। গভীর রাতে তৌহিদকে নিয়ে পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় তৌহিদ গুলিবিদ্ধ হলে হাসপাতালে নেয়ার পথে তৌহিদ মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি পিস্তল উদ্ধার করে। স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক কারণে বিগত সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমিশাপাড়া এলাকায় তৌহিদ নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের রোষানলে পড়ে। বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মিথ্যা মামলা হয়। প্রকৃত পক্ষে তৌহিদ কোন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ছিল না। রাজনৈতিক কারণেই পুলিশ তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় তৌহিদের পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ আমিশাপাড়া বাজারে প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়েছে। ডিউটি অফিসার এসআই আলমগীর কবির জানান, তৌহিদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে। এদিকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা গতকাল দুপুরে আমিশাপাড়া বাজারের বাবুল মেম্বার, সাবেক চেয়ারম্যান সুলতান, তাজু মিয়া, খলিল বোরহান, আরাফাত ফার্নিচার হাউস, বাজার কমিটির মোস্তাফিজ মিয়া, রতন মিয়ার সহ ২১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালিয়েছে।
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে র‌্যাবের গুলিতে গোলাম সরওয়ার নামে এক যুবদল নেতা নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকালে গ্রেপ্তার করার পর সদর উপজেলার উত্তর ফাজিলপুর গ্রামের লস্কর তালুক নামক স্থানে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি ফাজিলপুর ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি। তবে র‌্যাব-পুলিশের দাবি বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হয়েছেন। র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি কাটা রাইফেল ও একটি দেশীয় তৈরী এলজি উদ্ধার করেছে বলেও জানায়। স্থানীয়রা জানান, গোলাম সরওয়ার উত্তর ফাজিলপুর গ্রামে তার বোনের বাড়িতে আসেন। সেখান থেকে বিকাল ৪টার দিকে র‌্যাব-পুলিশের সদস্যরা আটক করে। পরে তালুক নামক স্থানে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এলাকাবাসী আরও জানায়, গত ইউপি নির্বাচনে গোলাম সরওয়ার ও তার পরিবারের লোকজন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী রুহুল আমিন চেয়ারম্যানের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা রিপন ক্ষিপ্ত হন। এ ঘটনার জের ধরে বিএনপি সমর্থিত ওই পরিবার আওয়ামী লীগের রোষানালে পড়ে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। তবে  পুলিশ জানায়, বিকাল ৪টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ফেনী ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা ফেনী সদর উপজেলার উত্তর ফাজিলপুর গ্রামের লস্কর তালুক নামক স্থানে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গোলাম সরওয়ারকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালায়। র‌্যাব ও পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গোলাম সরওয়ার তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। র‌্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। গুলিবিনিময়ের এক পর্যায়ে গোলাম সরওয়ার গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে চাঞ্চল্যকর আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ২নং নম্বর আসামি বাবলু মোল্লা (২৭) নিহত হয়েছেন। তিনি সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব বাঐতারা গ্রামের আবদুল ওয়াহাব মোল্লার ছেলে। এ সময় র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি শটগান, ২টি চাপাতি, ২টি ধারালো ছুরি, ৪টি ককটেল ও ৪ জোড়া ব্যবহৃত সান্ডেল উদ্ধার করেছে। ৩০শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সদর থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক সাইফুল ইসলামকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সিরাজগঞ্জ র‌্যাব ১২-র কোম্পানি কমান্ডার এএসপি অশোক কুমার পাল জানান, বুধবার রাত পৌনে ২টার দিকে শহরের হোসেনপুর মোল্লাবাড়ি সংলগ্ন যমুনা নদীর বালুর বাঁধ এলাকায় দুষ্কৃতকারীরা নাশকতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের ৩টি টিম সেখানে গিয়ে তাদের ঘিরে ফেলে। উপস্থিতি টের পেয়ে দুষ্কৃতকারীরা র‌্যাবের ওপর গুলি চালায়। র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় ক্রসফায়ারে বাবলুর মৃত্যু হলেও অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে নিহতের লাশ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। সিরাজগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের পরির্দশক নাসির উদ্দিন জানান, নিহত বাবলু আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি। এছাড়া তার নামে সিরাজগঞ্জ সদর ও বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিমপাড় থানায় ছিনতাই ও ডাকাতির অভিযোগে আরও ৩-৪টি মামলা রয়েছে। সে সাইফুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি কুখ্যাত নৌ-দস্যু জবান আলীর বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Comments